দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

সৌদি আরবে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত দুই সহোদর মোহন প্রামাণিক ও সুমন প্রামাণিক মৃত্যুর আগে বাবা-মায়ের সঙ্গে শেষবার কথা বলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইলে ইন্টারনেট সংযোগ না পাওয়ায় তাঁদের ফোন পৌঁছায়নি বাবা-মায়ের কাছে।
পরে ভয়েস মেসেজে নিজেদের শেষ কথাগুলো জানান দুই ভাই। সেখানে তারা বলেন, কারখানায় আগুন ধরেছে। দরজা বন্ধ থাকায় বের হতে পারছি না। হয়তো আমরা মারা যাব। আমাদের সঙ্গে আর দেখা হবে না। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।
এরপর আর কোনো ফোন আসেনি। ভয়েস মেসেজই হয়ে থাকে বাবা-মায়ের সঙ্গে দুই ভাইয়ের শেষ যোগাযোগ।
নিহত মোহন (২৫) ও সুমন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গন্ডগোহালী গ্রামের গোফ্ফার প্রামাণিকের ছেলে। রোববার সৌদি আরবের রিয়াদের খোরদাম শহরের একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে দুই সহোদরসহ অন্তত ১৭ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হন। তাদের মধ্যে আত্রাই উপজেলার ১৩ জন রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র ও উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে।
দুই ছেলের মৃত্যুর খবরে নির্বাক হয়ে পড়েছেন বাবা গোফ্ফার প্রামাণিক। সন্তান হারানোর শোকের সঙ্গে মৃত্যুর আগে তাদের সঙ্গে কথা বলতে না পারার আক্ষেপও তাকে ভেঙে দিয়েছে।
গোফ্ফার প্রামাণিক জানান, তার তিন ছেলে ও এক মেয়ে। তিনি নিজে এবং ছোট ছেলে মামুন হোসেন শারীরিক প্রতিবন্ধী। পরিবারের নিজস্ব কোনো জমিজমা নেই। সংসারের অভাব দূর করতে প্রায় আট বছর আগে ধারদেনা করে বড় ছেলে মোহনকে সৌদি আরবে পাঠান তিনি।
মোহন প্রবাসে গিয়ে কাজ শুরু করার পর কয়েক বছরের মধ্যে পরিবারের ধারদেনা পরিশোধ করেন। পরে প্রায় দুই বছর আগে ছোট ভাই সুমনকেও সৌদি আরবে পাঠানো হয়। দুই ভাই একই কারখানায় কাজ করতেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, দুই ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল প্রবাসে কাজ করে টাকা জমিয়ে দেশে একটি পাকা বাড়ি করবেন। এরপর একসঙ্গে দেশে ফিরে বিয়ে করে সংসার শুরু করবেন তারা।
সেই স্বপ্ন পূরণের অংশ হিসেবে গত বুধবার বাড়িতে নতুন ঘর নির্মাণের জন্য ভিত্তি স্থাপন করা হয়। কাজও শুরু হয়েছিল। এর কয়েক দিনের মধ্যেই সৌদি আরব থেকে আসে দুই ভাইয়ের মৃত্যুর খবর।
রোববার বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে রিয়াদের খোরদাম শহরের ওই সোফা তৈরির কারখানায় আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ভয়াবহ আকার ধারণ করলে শ্রমিকদের অনেকে ভেতরে আটকা পড়েন। পরে অন্তত ১৭ বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।
বাবা গোফ্ফার প্রামাণিক বলেন, আগুন লাগার পর দুই ছেলে বারবার ইমু ও হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তখন তাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকায় ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, পরে দুই ছেলে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে জানিয়েছিল, কারখানায় আগুন লেগেছে, দরজা বন্ধ থাকায় বের হতে পারছে না। হয়তো তারা মারা যাবে। তাদের সঙ্গে আর দেখা হবে না, তাদের জন্য দোয়া করতে বলেছিল।
উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৩ জন আত্রাই উপজেলার বাসিন্দা। তারা হলেন,পারকাসুন্দা গ্রামের জালাল, ডুবাই গ্রামের সুমন হোসেন, একই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভ, গন্ডগোহালী গ্রামের মোহন প্রামাণিক ও সুমন প্রামাণিক, একই গ্রামের রুবেল হোসেন ও কলিউদ্দিন প্রামাণিক, সাধনগর গ্রামের সাগর হোসেন, উদনপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ, মাদবপুর গ্রামের মজিদুল ইসলাম, ডুবাই গ্রামের সোহেল রানা, মধ্যেবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ এবং খরসতী গ্রামের মহিদুল ইসলাম।
দুই সহোদরের মৃত্যুর খবরে আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গন্ডগোহালী গ্রামের গোফ্ফার প্রামাণিকের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। কয়েক দিন আগে যে বাড়িতে দুই ভাইয়ের স্বপ্নের নতুন ঘরের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল, এখন সেখানেই তাদের মরদেহের অপেক্ষায় স্বজনরা।
নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন স্বজনরা।
দুই ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল একসঙ্গে বাড়ি করবেন, একসঙ্গে বিয়ে করে সংসার পাতবেন। বাড়ির কাজ শুরু হলেও সেই স্বপ্ন পূরণ হলো না। দেশে ফেরার আগেই থেমে গেল তাঁদের জীবনযাত্রা। বাবা-মায়ের কাছে বলা ‘আর দেখা হবে না, দোয়া করবেন’ কথাগুলোই এখন তাদের শেষ স্মৃতি।
যে আই